ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা আজ

ট্রাম্প-উরসুলার বৈঠকে নিরসন হবে ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্য বিবাদ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে স্কটল্যান্ডে আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডর লিয়েন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে স্কটল্যান্ডে আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডর লিয়েন। আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ বৈঠকের ফলে দুই বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্য বিবাদ নিরসনের আশাবাদ দেখছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উরসুলা ভন ডর লিয়েনের মন্তব্যেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। খবর এফটি ও রয়টার্স।

চুক্তির খসড়ার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আমদানি করা বেশির ভাগ পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারে।

গত শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জানান, ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্য সম্পর্ক এবং কীভাবে তা মজবুত রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে স্কটল্যান্ডে।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্কটল্যান্ডে ছুটি কাটাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সময় দিয়েছেন তিনি, ইস্পাত ও হুইস্কির ওপর শুল্ক কমাতে কাজ করছেন। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে স্কটল্যান্ড সফরে আছেন উরসুলা ভন ডর লিয়েন।

ধারণা করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ১ আগস্টের সময়সীমার আগেই চলমান আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। নতুবা যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে ট্রাম্প ঘোষিত ৩০ শতাংশ হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে ইউরোপকে।

ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চার মাস ধরে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগে অঞ্চলটির পণ্যের ওপর গড় শুল্কের হার ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

স্কটল্যান্ডের উদ্দেশে শুক্রবার সকালে হোয়াইট হাউজ ছাড়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ইইউর সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা ৫০-৫০ অথবা হয়তো এর চেয়েও কম।’

তিনি আরো জানান, নিজেদের শুল্ক কমানোর মতো ব্যবস্থা ইইউকেই করে নিতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চুক্তি। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামনে ভালো সম্ভাবনা আছে।’

স্কটল্যান্ডে পৌঁছানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, আলোচনার ক্ষেত্রে প্রায় ২০টি ‘সংবেদনশীল বিষয়’ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

গত সপ্তাহে এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্য অংশীদার জাপানের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টরের মতো কৌশলগত খাতে ৫৫০ বিলিয়ন বা ৫৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে টোকিও। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘জাপান কার্যত শুল্ক কমানোর দায়ভার নিজেদের কাঁধে নিয়েছে।’ তবে ইইউ কী দেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য মেলেনি। একজন কূটনীতিক জানান, জাপানের মতো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরিকল্পনা ইউরোপের নেই।

২০২৩ সালে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য ও সেবা লেনদেনের আকার ছিল ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে জানিয়েছিলেন, অঞ্চলটির সঙ্গে তিনি প্রায় ২০০ বিলিয়ন ইউরো বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চান।

ধারণা করা হচ্ছে, জাপানের মতো ইইউর পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর মার্কিন শুল্ক ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা হবে। ইইউ চায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশের নিচে হোক।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ওষুধের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তবে তা কমে ১৫ শতাংশ হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া উভয় পক্ষ উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর শুল্ক মওকুফে সম্মত হয়েছে।

এ চুক্তির ক্ষেত্রে ইইউর সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সপ্তাহান্তে রাষ্ট্রদূতদের এক জরুরি বৈঠকে তা অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। যদি চুক্তি হয়, তবে ব্রাসেলস ৭ আগস্ট থেকে ৯ হাজার ৩০০ কোটি ইউরোর মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত করবে।

অবশ্য চুক্তির বিষয়ে ইইউর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন শিল্পখাতের ওপর চাপ কমাতে দ্রুত চুক্তির পক্ষে মত দিয়েছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ। অন্যদিকে ভালো একটি চুক্তির আশায় অপেক্ষাকৃত ধীরে এগোতে চেয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি আমদানি বিষয়ে আলাদা চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন ইউরোপীয় নির্মাতারা। কারণ শুল্কজনিত চাপে শুধু ফক্সওয়াগনই ১৩০ কোটি ইউরো ক্ষতির মুখে পড়েছে। যদি ইউরোপীয় গাড়ি আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারণ হয়, তাহলেও এটি মহাদেশটির নির্মাতাদের জন্য বড় বিজয় হবে। কারণ ইউরোপীয় গাড়ি রফতানির প্রায় ১০ শতাংশেরই গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, একটি সম্ভাব্য ইউএস-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। ওয়েলস ফারগো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ইকুইটি অ্যান্ড রিয়েল অ্যাসেট বিভাগের প্রধান সামির সামানা বলেন, ‘এটি আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সম্পর্কগুলোর অন্যতম। যদি চূড়ান্ত চুক্তি হয়ে যায়, তাহলে হয়তো আরো বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরে আসবে। বড় একটি অনিশ্চয়তা কাটবে।’

অবশ্য বিনিয়োগকারীরা মার্কিন-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের দিকেও নজর রাখছেন। দুই দেশের কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে স্টকহোমে বৈঠক করবেন এবং আগামী ১২ আগস্টের সময়সীমা বাড়ানো হবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

আরও